যৌন পরিচয়ের কারণে দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতন, সামাজিক বয়কট ও প্রাণনাশের হুমকির শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলে এক বাংলাদেশি তরুণ কানাডায় স্থায়ী আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। তাঁর দাবি, বাংলাদেশে একাধিকবার হামলা, মারধর ও বৈষম্যের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের নিরাপত্তার জন্য দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। ভুক্তভোগীর বর্ণনা অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি ও এপ্রিল মাসে তাঁর ওপর পৃথকভাবে হামলার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে একটি হামলায় তিনি গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসা শেষে ২০১৮ সালের ২১ জুন তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। তিনি জানান, তাঁর পরিবার ব্যক্তিগতভাবে তাঁর যৌন পরিচয় সম্পর্কে অবগত থাকলেও সামাজিক চাপ ও নিরাপত্তার আশঙ্কায় প্রকাশ্যে তাঁকে অস্বীকার করতে বাধ্য হয়। এরপর আত্মীয়স্বজন তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়াতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি পারিবারিক ও সামাজিকভাবে অনেকটাই একঘরে হয়ে পড়েন। তাঁর অভিযোগ, ২০১৮ সালের ১ জুলাই এলাকাবাসীর একটি দল তাঁর বাড়িতে হামলা চালায়। হামলাকারীরা তাঁকে মারধর করে বাড়ি থেকে টেনে বাইরে নিয়ে যায় এবং জনসমক্ষে অপদস্থ করে। একই সঙ্গে তাঁকে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। হামলাকারীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, তাঁর মতো মানুষের বাংলাদেশে থাকার অধিকার নেই। এসব ঘটনার পর
পরিবারের সহযোগিতায় তিনি উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে কানাডার স্টাডি ভিসার জন্য আবেদন করেন এবং পরবর্তী সময়ে কানাডায় চলে যান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কানাডায় যাওয়ার পরই প্রথমবারের মতো তিনি নিজের পরিচয় নিয়ে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের সুযোগ পান। তবে ২০২৩ সালের ১৮ জানুয়ারি ব্যক্তিগত কারণে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। দেশে অবস্থানকালে তিনি তাঁর সঙ্গী আবিরের সঙ্গে গোপনে দেখা করতে থাকেন। তাঁর অভিযোগ, ২০২৩ সালের ২৮ জানুয়ারি স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি তাঁদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় তাঁকে ও তাঁর সঙ্গীকে কাঠের তক্তা দিয়ে মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চিকিৎসাধীন থাকতে হয়। তিনি আরও দাবি করেন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর বাবা তাঁকে দেশে ফিরে আসার জন্য তিরস্কার করেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, তাঁর নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিদেশেই থাকা উচিত ছিল বলে বাবা তাঁকে সতর্ক করেছিলেন। এরপর তিনি আবার কানাডায় ফিরে যান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়েও বাংলাদেশে ফিরে এসে তিনি পুনরায় সহিংসতার শিকার হন এবং হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। তাঁর দাবি, প্রতিবার দেশে ফিরে আসাই তাঁর জন্য জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি করেছিল। ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবার সামাজিকভাবে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছে, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাঁকে হুমকি দিয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকেও তিনি কার্যকর কোনো সহায়তা পাননি। এসব পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালের ২১ মে তিনি শেষবারের মতো কানাডায় ফিরে যান এবং আর বাংলাদেশে না ফেরার সিদ্ধান্ত নেন বর্তমানে তিনি কানাডায় শরণার্থী সুরক্ষা চেয়ে আবেদন করেছেন। তাঁর দাবি, বাংলাদেশে ফিরে গেলে তাঁর জীবন আবারও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ চেয়েছেন তিনি, যাতে নিজের যৌন পরিচয় নিয়ে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারেন। তবে কানাডায় অবস্থান করেও তাঁর বিরুদ্ধে হুমকি বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, ২০২৬ সালের ২২ ও ২৭ জুলাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে উদ্দেশ্য করে একাধিক ভয়েস মেসেজ ও লিখিত বার্তার মাধ্যমে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বার্তায় তাঁকে খুঁজে বের করার কথা বলা হয়, অশ্লীল ও অপমানজনক ভাষায় গালিগালাজ করা হয় এবং বাংলাদেশে ফিরলে হত্যা কিংবা গুরুতর নির্যাতনের হুমকি দেওয়া হয়। তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন ব্যক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে এসব হুমকি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে কানাডায় অবস্থান করেও তিনি নিজেকে নিরাপদ মনে করছেন না। এরই মধ্যে তাঁর আরও অভিযোগ, ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট তিনি দেশে না থাকাকালে তাঁর বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়। হামলাকারীরা তাঁকে বাড়িতে না পেয়ে পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি দেখায় এবং হুমকি দিয়ে যায়—তিনি বাংলাদেশে ফিরে এলে যেকোনো উপায়ে তাঁকে তুলে নিয়ে হত্যা অথবা গুরুতর নির্যাতন করা হবে। ভুক্তভোগীর দাবি, বাংলাদেশ ছেড়ে আসার পরও তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, সামাজিক হয়রানি ও প্রাণনাশের হুমকি অব্যাহত রয়েছে। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতা তুলে ধরে তিনি কানাডার কাছে শরণার্থী সুরক্ষা চেয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, বাংলাদেশে ফিরে গেলে তাঁর জীবন ও নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়বে এবং সেখানে নিজের পরিচয় নিয়ে নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে বসবাস করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।