June 2, 2026, 12:30 pm
শিরোনাম :
জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটে মাইক্রো-প্লাস্টিক দূষণ প্রতিরোধ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত যৌন পরিচয়ের কারণে নির্যাতনের শিকার যুবক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ঢাকা স্কুল অব ব্রডকাস্ট জার্নালিজম ও রবিন ডেন্টালের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক সাংবাদিকতায় সচেতনতা বাড়াতে জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটে কর্মশালা অনুষ্ঠিত ঠাকুরগাঁওয়ে হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন উপলক্ষে সাংবাদিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত ঠাকুরগাঁওয়ে সার বরাদ্দে ‘কমিশন বাণিজ্য’: কৃষি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ সারাবাংলা ৮৮, চুয়াডাঙ্গা জেলা প্যানেলের উদ্যোগে ঈদ উপহার বিতরণ বিপিজেএফের উদ্যোগে শতাধিক অসহায় ও দুস্থদের মাঝে ইফতার ও অনুদান বিতরণ পিবজা’র উদ্যোগে পিআইবিতে ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত পঞ্চগড়ে ক্রয়কৃত জমিতে থাকা ২টি সীমানা পিলার ভাংচুর

ঘুরে ঘুরে মানুষকে জগৎ দেখানো কন্টেন্ট ক্রিয়েটর- বনি আমিনের মনের কষ্ট

ডেস্ক রিপোর্ট

ঘুরে ঘুরে মানুষকে এই বিশ্ব জাহানের নানা রকম খুঁটিনাটি বিষয় দুনিয়ার সকল বাংলাভাষাভাষী মানুষের সামনে যে মানুষটি তুলে ধরছেন, তার নাম বনি আমিন। তিনি আজ তার ফেসবুক টাইমলাইনে তার বাবার মৃত্যু নিয়ে একটি আবেগঘন পোস্ট দিয়েছেন। উক্ত পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো-  “আমার বাবার মৃত্যুর জন্যে কারা দায়ী! ছবির মানুষটি আমার বাবা। খুব অল্প বয়সেই—১৯৯৩ সালের নভেম্বর মাসে—বড্ড অভিমানে তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। আমি তখন সদ্য গড়া সংসারের দায় কাঁধে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় সংগ্রামের ভেতর। বাবার মৃত্যুসংবাদ এসেছিল কোনো এক মামার ফোনে। সেই মুহূর্তে দেশে উড়ে গিয়ে মায়ের পাশে দাঁড়ানো, ছোট ছোট ভাইবোনদের মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনার ভাষা খোঁজার সামর্থ্য আমার ছিল না। আজ যেভাবে ঢাকা–নারায়ণগঞ্জের পথ পাড়ি দেওয়ার মতো অনায়াসে আমি সারা দুনিয়া ঘুরি, তখন বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন—যদিও আমার বিদেশযাত্রার শুরু ১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বর থেকেই। সেই দুঃখে, সেই কষ্টে একে একে তাই আমি সকলকে জন্মদেশ থেকে নিয়ে এসেছি। আর প্রতিমুহূর্তে আমি মনে মনে বলেছি ‘দূর হ জন্মদেশ’

আমি বাবা–মায়ের প্রথম সন্তান। আমার বাবা ছিলেন জন্মদেশের কর বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। ১৯৯০ সালের দিকে তিনি অবসর নেন। বড় ছেলে ও সন্তান হিসেবে বাবার জীবনের অনেক না বলা কথা তিনি একান্তে আমাকে কানে কানে বলে গেছেন, এমনকি তার মৃত্যুর কারণও — যা আমার অন্য ভাইবোনেরা একদম জানেই না।

বাবার অবসরের পরপরই আমি লন্ডনে চলে যাই, পরের বছর অস্ট্রেলিয়ায়। বাবা স্ট্রোক করার আগ পর্যন্ত নিয়মিত আমাকে তিনি চিঠি লিখতেন। আজও সেসব চিঠি আমার কাছে যত্নে রাখা—১৯৭৫ সাল থেকে একটি চিঠিও নষ্ট হয়নি। বাবার অবসর-পরবর্তী জীবন আমাকে ভীষণভাবে ভাবাত। তিনি বলতেন, “চিন্তা করিস না, তোর মামা আছে না, সে আমাকে ফেলবে না।” কাঁধে হাত রেখে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছিলেন—তোর মামার হাতিয়া থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত যাত্রাপথ সম্পূর্ণ আমার অবদান, আর তাছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে তুমি যে মামাকে এল.এল.বি. পাশ করিয়েছো অন্তত সে তোমার কথা মনে করেও আমাকে ফেলবে না। আমার রিটায়ার্ড বাবা স্বপ্ন দেখেছিলেন, অন্তত সেই মামার চেম্বারের এক কোণে একটা চেয়ার পেলেও জীবনের শেষ সময়টা তিনি কাটিয়ে দিতে পারবেন। কী নির্মম ভুল ছিল বাবার সেই বিশ্বাস!

অবসরের পর মানুষ যে কত দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যায়, তা বাবা বুঝতে পারেননি। কেউ আর তাকে “দুলাভাই” বলে হাত কচলাতে আসেনি, কেউ টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে সালাম দেয়নি। তবুও আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে চিটাগাং রিয়াজউদ্দিন বাজারে তিনি (আমার মায়ের মামাতো ভাই) মামার চেম্বারে যেতেন নিজের অবদানের দাবি নিয়ে। অল্পদিনেই বুঝে গেলেন, সেখানে তিনি কেবল অবহেলিত, অনাহূত, অপ্রয়োজনীয়। যাওয়া বন্ধ করলেন।

এরপর শুরু হলো বাবার নিঃসঙ্গতা। ধীরে ধীরে তিনি ঘরবন্দি হলেন বাবা, হতাশার অন্ধকারে ডুবে যেতে লাগলেন। আমার বাবার পরিবারে অর্থের অভাব ছিল না—ছিল মানুষের অভাব, ছিল মানসিক সাপোর্টের শূন্যতা। একদিন আমার সামনেই তিনি স্ট্রোক করলেন। আমি তখন লন্ডন থেকে অস্ট্রেলিয়ায় ফেরার প্রস্তুতিতে দেশে এসেছি মাত্র এক সপ্তাহ আগে। বাবার সেই অসুস্থতায় আমি দেশে আটকে গেলাম। চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা ভেরোনিকাকে তার মা–ভাইবোনের কাছে একা অস্ট্রেলিয়ায় পাঠিয়ে দিলাম। আমার ছেলে এটর্নি (সলিসিটর) উপল আমিনের জন্ম এই সিডনিতে।

সেই সময় অসহায়ত্ব আমাকেও গ্রাস করেছিল, কিন্তু হাতে ছিলো অস্ট্রেলিয়ান PR ভিসা, তবুও মনে হতাশা। আমি তখন খুব কাছ থেকে মানুষ চিনলাম। বুঝলাম—এই দুনিয়া ভয়ানক নিষ্ঠুর। সেদিনই প্রতিজ্ঞা করলাম, জীবনে এমন কোনো পেশায় যাব না যেখানে “রিটায়ারমেন্ট” আছে। আজও রিটায়ারমেন্ট শব্দটা আমাকে ভীত করে। বাবার নিঃসঙ্গ মুখ মনে পড়ে যায়। তাই ক্ষমতাহীন অবসরপ্রাপ্ত মানুষদের আমি অজান্তেই এড়িয়ে চলি (যৌবনে সে কতবড় পদে বা কত ক্ষমতাবান ছিলো তা আমি গনি না। তবে তার ক্ষমতা থাকাবস্থায় যদি সে কোনভাবে আমার কাজে এসেছে তবে তাকে আমি বুকে আগলে রাখি আমৃত্যু)

মৃত্যুর আগে বাবা কানে কানে বলেছিলেন— তার এই নিঃসঙ্গতা, বিষণ্নতা আর অকাল মৃত্যুর জন্য হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ দায়ী। তাদের একজন আমার সেই মামা, যিনি এখন ‘রাতে’র কাজ ছেড়ে ‘দিনে’র কাজে তবলীগে চিল্লা মারতে নেমেছেন। বাবার কাঁপা কণ্ঠ, ভাঙা চোখ—আমি আজও ভুলতে পারিনি। আমার ভাইবোনেরা কেউই এসব জানে না, আমি নীরবে বাবার কষ্ট কথা আজো ধারণ করে রেখেছি।

সেই মামা— যিনি ‘সাতশো ইঁদুর মেরে হজে যাওয়া’র মতো জীবনের সব অপকর্ম শেষে, শরীরের সকল ‘কল কব্জা’ বিকল হওয়ার পরে এখন তিনি তাবলীগে চিল্লা মারতে নেমেছেন। আহা তিনি, রাতের কাজ ছেড়ে দিনের পথে নেমেছেন। তাবলীগের জুব্বা গায়ে চাপিয়ে সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় এসেছেন। বাবার অকাল মৃত্যুর কথা মনে করে তার সঙ্গে দেখা করা বা তাকে সময় দেয়া আমার কাছে বাবার লাশের ওপর পা রাখার মতো মনে হচ্ছিলো।

অস্ট্রেলিয়াতে নেমে তিনি বহুবার আমাকে ফোন করেছেন—ভাগ্নের সঙ্গে সিডনি ঘুরবেন, মধুর সময় কাটাবেন। আমি বিনয়ের সঙ্গে সর্বদা এড়িয়ে গেছি। আমার বাসায় ডাকাতো থাক দূরের কথা এমনকি আমার ছেলে এবং মেয়েকেও সতর্ক করে দিয়েছি যে এই সেই ব্যাক্তি যার কারণে তোমার দাদুর অকাল মৃত্যু হয়েছিল। তার থেকে দূরে থাকবে, অনেক ক্রোশ দূরে – বহু দূরে। ‘বাই নেচার’ আমার জীবনে সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষ হলো ‘কঞ্জুষে আওলাদ’— অর্থাৎ যে লোক টাকার জন্য অসহায় পিঁপড়ার মুখ থেকেও চিনির দানা ছিনিয়ে নিতে পারে। আমার মামা ঠিক তেমনই একজন। জীবনে কেউ তার কাছ থেকে বিনা স্বার্থে এক কাপ চা খেতে পেরেছে তেমন কাউকে আমি খুঁজে পাইনি, কিন্তু মামা কোটি টাকার মালিকঃ যার সাফল্যতার সম্পূর্ণ অবদান আমার প্রয়াত পিতার।

গত ৩৫ বছরে আমি অগণিতবার জন্মদেশে গিয়েছি, চট্টগ্রামে গেছি। এই ‘দিনের মামা’ কখনো একবারও আমাকে ডেকে এক কাপ চা পর্যন্ত খাওয়ায়নি। তবে চট্টগ্রামে একবার তার ভাড়া বাসায় ডিনারে আমাকে ডেকেছিলেন—গিয়ে দেখি পাড়া-প্রতিবেশী মিলিয়ে ডজনখানেক পরিবার। অর্থাৎ তার দাওয়াত খাওয়ার পরিবারগুলোকে ‘খাওয়া পরিশোধ’ করতে এই আয়োজন। আমি ছিলাম কেবল উসিলা। কিভাবে এই মানুষটাই আজ আশা করে—আমি অস্ট্রেলিয়ায় তাকে সময় দেব!

বারবার ফোন দিয়ে আমাকে পেতে চাইতো, আমি একদিন তাকে ফোনে জিজ্ঞেস করেছিলাম— বুকে হাত দিয়ে বলুনঃ “গত ৩৫ বছরে আমাকে আপনি এক ঘণ্টা সময় দিয়েছেন? বা রিটায়ারমেন্টের পরে জীবিতাবস্থায় আমার বাবাকে”, তিনি উত্তর দিতে পারেননি। তবে চো DU বাঙ্গালীর মত হালকা আবেগ মিশ্রিত কেঁদো কণ্ঠে বলেছিলেন, “ভুল করেছি মামা, ক্ষমা করো, রাতের কাজ ছেড়ে আমি এখন দিনের কাজে আল্লাহর পথে আছি।” আমি বলেছিলাম, “কলকব্জা নষ্ট হওয়ার পরে তবলীগ বা চিল্লায় কাজ কী? আর তাছাড়া দেশে গিয়ে পুনরায় আপনার এক কাপ চা পেতে হলে কি আমাকে আরও ৩৫ বছর অপেক্ষা করতে হবে? সে সময় কোথায়?” তারপর ফোন কেটে দিয়েছিলাম।

শেষ কথা—
অস্ট্রেলিয়ায় আত্মীয় বা অনাত্মীয় কেউ বেড়াতে এলে তাকে সময় দেওয়ার আগে ভাবুন, দেশে থাকতে সে আপনাকে কী দিয়েছে। কঞ্জুষ মানুষ থেকে সর্বদা দূরে থাকুন—তারা কখনো বিপদে আপনার কাজে আসবে না।

আমার বাবার অকাল মৃত্যুর জন্য দায়ী মানুষদের একজন আজ সিডনীতে ‘দিনের’ কাজে বেড়াতে এসে আমার কাছে সময় চাইছে — এটাই সবচেয়ে বড় বিস্ময়। আল্লাহ সবাইকে বোঝার তৌফিক দিন। ধন্যবাদ।”


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুক পেইজ