
লেখকের ছবি। ছবি: সংগৃহিত।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে কর্মী নিয়োগের সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারী নির্বাচনী পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়ে থাকেন। ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান চাইলেই তার পছন্দনীয় ব্যক্তিকে যেকোনো পদে বসিয়ে দিতে পারেন। এমন কী চাইলে তার নিজের আত্মীয়স্বজনকে কোম্পানির শীর্ষ পদে বসিয়ে দিতে পারেন। ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে একজন কর্মীর বয়সসীমা বলে তেমন কিছু থাকে না। মালিক চাইলে যে কাউকে নির্দিষ্ট বয়সের পরও চাকরিতে বহাল রাখতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে প্রবেশ এবং চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের একটি নির্দিষ্ট বয়স আছে। সেই বয়সসীমা সবাইকে মেনে চলতে হয়।
ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় সরাসরি মালিকের অধীনে। অর্থাৎ ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে মালিক স্বয়ং উপস্থিত থাকেন। আর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় প্রতিনিধির মাধ্যমে। মালিক সেখানে সরাসরি উপস্থিত থাকেন না। ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে মালিক স্বয়ং উপস্থিত থাকেন বলে সেখানে জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতা থাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে কোনো কর্মী দুর্নীতি বা অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত হলেই তার চাকরিচ্যুতি বা কঠোর শাস্তি অনিবার্য। কিন্তু রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে মালিক স্বয়ং উপস্থিত থাকেন না বলে সেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কোনো বালাই থাকে না। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে ‘দুর্নীতির সঙ্গে দুর্ভাগ্য’ যুক্ত না হলে কারও চাকরি যায় না। কিন্তু ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে সামান্য দুর্নীতি বা অনিয়মের ঘটনা ঘটলেও একজন কর্মীর চাকরি চলে যেতে পারে।
সর্বশেষ বেতন কাঠামো অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের যে বেতন-ভাতা প্রদান করা হয় তা বেশ মেটো অঙ্কের হলেও বর্তমান অস্বাভাবিক উচ্চ মূল্যস্ফীতিকালে তা পর্যাপ্ত বলে বিবেচনার অবকাশ নেই। এই বেতন-ভাতা দিয়ে স্ট্যাটাস অনুযায়ী একজন কর্মকর্তার সংসার চালানোই কঠিন। এরপরও যদি কোনো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী বিত্তের পাহাড় গড়ে তোলেন তাহলে বুঝতে হবে ‘ডাল মে কুচ কালা হ্যায়।’ কিছু দিন আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন বলেছিলেন, কানাডার বেগম পাড়ায় যেসব বাংলাদেশির বাড়ি রয়েছে তাদের একটি বড় অংশই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা যদি সৎভাবে জীবনযাপন করেন তাহলে তার সংসার চালানোই কঠিন। তিনি কানাডায় বাড়ি ক্রয় করেন কীভাবে? রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই দুর্নীতি আর অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান মূলত দুর্নীতি আর অনিয়মের কারণেই বছরের পর বছর লোকসান দিচ্ছে। একই ধরনের ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান লাভজনকভাবে পরিচালিত হলেও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান লোকসান দিচ্ছে। যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যেত তাহলে কোনো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানই লোকসান দিতে পারে না।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ কর্মীই প্রতিষ্ঠানটিকে নিজের প্রতিষ্ঠান মনে করেন না। তারা মনে করেন, ৫৯ বছর বয়স হয়ে গেলে তাদের প্রতিষ্ঠানের চাকরি থেকে অবসর নিতে হবে। কাজেই সময় থাকতে যা পার করে নাও। তাই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে চাকরি পদ্ধতির ব্যাপক পরিবর্তন করা প্রয়োজন। চাকরি পদ্ধতি পরিবর্তন ছাড়া কর্মীদের মনোভাব পাল্টানো যাবে না। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে একবার চাকরিতে প্রবেশ করতে পারলে ৫৯ বছর বয়স পর্যন্ত তার কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়ে যায়। এটা একজন কর্মীর মনে অহমিকা জাগ্রত করতে পারে। তাই এ পদ্ধতি পরিবর্তন করা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী চাকরির ব্যবস্থা বা পদ্ধতি পরিবর্তন করা প্রয়োজন। প্রতিটি চাকরিতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কর্মী নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। যেমন, একজন কর্মী তিন বছরের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ লাভ করবেন। এই তিন বছরে তার কার্যক্রম এবং আচার-আচরণ যদি সন্তোষজনক হয় তাহলে পরবর্তী পদে পদোন্নতি দিয়ে চাকরির মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়ানো যেতে পারে। এভাবে তিন বছর পর পর পদোন্নতিসহ চাকরির মেয়াদ বাড়তে থাকবে। একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর তারা চাকরি থেকে অবসরে গমন করবেন। কারও মাঝে দক্ষতার অভাব দেখা দিলে তাকে একই পদে আরও তিন বছর রাখা যেতে পারে। কিন্তু কারও মাঝে সামান্যতম দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে চাকরিচ্যুত করা যেতে পারে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একটি আলাদা বিভাগ থাকবে, যারা কর্মীদের দক্ষতা এবং সততা নিশ্চিত করবেন।
একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের অ্যানুয়াল কনফিডেন্সিয়াল রিপোর্ট (এসিআর) লিখন পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে। বর্তমানে অধিকাংশ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তার নিচের পর্যায়ের কর্মকর্তার এসিআর লিখে থাকেন। এসিআর খারাপ হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পদোন্নতি, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি সুবিধা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এমনকি পদাবনতিও ঘটতে পারে। তাই নিচের পর্যায়ের কর্মকর্তারা সব সময়ই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তোয়াজ করে চলতে বাধ্য হন। এসিআর লিখন পদ্ধতি চালু করেছিল ইংরেজরা। তারা স্থানীয়দের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বহাল রাখার জন্য এই পদ্ধতির উদ্ভাবন করেছিলেন। একটি স্বাধীন দেশে এসিআরের মতো অমানবিক পদ্ধতি থাকা উচিত নয়। আর যদি এই পদ্ধতি বহাল রাখতে হয় তাহলে তা হওয়া উচিত দ্বিমুখী পদ্ধতি। অর্থাৎ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যেমন তার নিচের পর্যায়ের কর্মকর্তার এসিআর লিখবেন, তেমনি নিচের পর্যায়ের কর্মকর্তাও তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার এসিআর লিখবেন।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে প্রায়ই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগদানের একটি পদ্ধতি প্রত্যক্ষ করা যায়। এটি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা উচিত। কারণ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা কখনোই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কর্মকর্তার মতো দায়িত্বশীল এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনুগত হতে পারেন না। কেউ-ই একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যাবশ্যক নন। পৃথিবীতে এখনো এমন কোনো ব্যক্তির জন্ম হয়নি যাকে ছাড়া একটি প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। একজন ব্যক্তিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হলে সেই প্রতিষ্ঠানের নিচের পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাঝে হতাশা নেমে আসতে বাধ্য। কারণ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নিচের লেভেলের প্রতিটি কর্মীর পদোন্নতি বন্ধ হয়ে যায়। চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়বদ্ধ হতে পারেন না।
সম্প্রতি একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৪টি বাড়ি ক্রয়ের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। তিনি একটানা ১৩ বছর সেই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্বে আসীন রয়েছেন। এই ভদ্রলোকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নানা অভিযোগ উত্থাপিত হলেও তার ব্যাপারে কোনো তদন্ত এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। যদিও তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ১৪টি বাড়ি থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ২০১৮ সালে ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মূল বেতনের পরিমাণ ছিল ৭০ কোটি টাকা। আর আড়াই হাজার স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী ওভার টাইম ভাতা গ্রহণ করেছেন ৯৫ কোটি টাকা। অভিযুক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ১৩ বছরে বেতন-ভাতা নিয়েছেন ৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এই হচ্ছে চুক্তিভিত্তিক চাকরির দৃষ্টান্ত।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচাতে হলে এদের পরিচালন পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করতে হবে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে দলীয় রাজনীতি চর্চা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। যারা এসব প্রতিষ্ঠানে বসে দলীয় রাজনীতি চর্চা করেন তাদের উদ্দেশ্য কখনোই ভালো হতে পারে না। কারণ এরা সব সময়ই সরকারদলীয় রাজনীতি করে থাকেন। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, অতীত অপকর্ম থেকে নিজেদের রক্ষা করা অথবা নতুন করে দুর্নীতি-অপকর্মের সুযোগ সৃষ্টি করা। কাজেই এদের কোনোভাবেই ছাড় দেয়া উচিত হবে না।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার-বিডিবিএল ও অর্থনীতিবিষয়ক লেখক